Unknown Unknown Author
Title: সুরা আল-বাকারা (১-১০ আয়াত) (পর্ব- ২)
Author: Unknown
Rating 5 of 5 Des:
সুরার নামঃ আল-বাকারা সুরা নম্বরঃ ২  সুরার ধরণঃ মাদানী সর্বমোট আয়াতঃ ২৮৬ অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)। ...

সুরার নামঃ আল-বাকারা
সুরা নম্বরঃ ২ 
সুরার ধরণঃ মাদানী
সর্বমোট আয়াতঃ ২৮৬

অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)।

১। আলিফ লা-ম মী-ম।

এগুলোকে ‘হুরূফে মুক্বাত্ত্বাআত’ (ছিন্ন অক্ষরমালা বা বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা) বলা হয়। অর্থাৎ, একটি একটি ক’রে পঠনীয় অক্ষর। এগুলোর অর্থের ব্যাপারে কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নেই। আল্লাহই এর অর্থ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত। তবে নবী করীম (সাঃ) এ কথা অবশ্যই বলেছেন যে, আমি এ কথা বলি না যে, ‘আলিফ লাম মীম’ একটি অক্ষর। বরং ‘আলিফ’ একটি অক্ষর, ‘লাম’ একটি অক্ষর এবং ‘মীম’ একটি অক্ষর। প্রত্যেক অক্ষরে একটি করে নেকী হয়। আর একটি নেকীর প্রতিদান দশটি করে পাওয়া যায়। (সুনানে তিরমিযী, পরিচ্ছেদঃ ক্বুরআনের ফযীলত, অধ্যায়ঃ যে ক্বুরআনের একটি অক্ষর পড়ে)

২। এ গ্রন্থ; (কুরআন) এতে কোন সন্দেহ নেই, [1] সাবধানীদের জন্য এ (গ্রন্থ) পথ-নির্দেশক।[2]

[1] এ কিতাবের অবতরণ যে আল্লাহর নিকট থেকে এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, ‘‘এ কিতাবের অবতরণ বিশ্বপালনকর্তার নিকট থেকে এতে কোন সন্দেহ নেই।’’ (সূরা সাজদা ২) কোন কোন আলেমগণ বলেছেন, বাক্যটি ঘোষণামূলক হলেও তার অর্থ নিষেধমূলক। অর্থাৎ, لاَ تَرتَابُوا فِيهِ (এতে সন্দেহ করো না)। এ ছাড়াও এতে যেসব ঘটনাবলী উল্লেখ করা হয়েছে তার সত্যতা সম্পর্কে, যেসব বিধি-বিধান ও মসলা-মাসায়েল বর্ণিত হয়েছে সে সবের উপর মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি যে নির্ভরশীল সে ব্যাপারে এবং যেসব আক্বীদা (তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত) সংক্রান্ত বিষয় আলোচিত হয়েছে তার সত্য হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ নেই।

[2] এই ঐশী গ্রন্থ আসলে তো সমস্ত মানুষের হিদায়াত এবং পথ প্রদর্শনের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে, কিন্তু এই নির্ঝরের পানি দ্বারা কেবল তারাই সিক্ত হবে, যারা ‘আবে হায়াত’ (সঞ্জীবনী পানি)-এর সন্ধানী এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হবে। আর যাদের অন্তরে মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করার অনুভূতি এবং চিন্তা নেই, যাদের মধ্যে সুপথ সন্ধানের অথবা ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার কোনই উৎসাহ ও আগ্রহ নেই, তারা সুপথ কোথা থেকে এবং কেনই বা পাবে? (সকাল তো তাদের জন্য, যারা ঘুম ছেড়ে চোখের পাতা মেলে জেগে ওঠে।)

৩। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, [1] যথাযথভাবে নামায পড়ে[2] ও তাদেরকে যা দান করেছি তা হতে ব্যয় করে। [3]

[1] গায়বী, অদৃশ্য তথা অদেখা বিষয়সমূহ হল এমন সব জিনিস যার উপলব্ধি জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্ভব নয়। যেমন মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর অহী (প্রত্যাদেশ), জান্নাত ও জাহান্নাম, ফিরিশতা, কবরের আযাব এবং মৃত দেহের পুনরুত্থান ইত্যাদি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাঃ) কর্তৃক বর্ণিত এমন কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের অংশ যা জ্ঞান ও ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না। আর তা অস্বীকার করা কুফরী ও ভ্রষ্টতা।

[2] যথাযথভাবে নামায পড়া বা নামায কায়েম করার অর্থ হল, নিয়মিতভাবে রসূল (সাঃ)-এর তরীকা অনুযায়ী নামায আদায়ের প্রতি যত্ন নেওয়া। নচেৎ নামায তো মুনাফিকরাও পড়তো।

[3] ‘ব্যয় করা’ কথাটি ব্যাপক; যাতে ফরয ও নফল উভয় প্রকার (ব্যয়, খরচ, দান বা সদকা)ই শামিল। ঈমানদাররা তাদের সামর্থ্যানুযায়ী উভয় প্রকার সদকার ব্যাপারে কোন প্রকার কৃপণতা করে না। এমনকি পিতা-মাতা এবং পরিবার ও সন্তান-সন্ততির উপর ব্যয় করাও এই ‘ব্যয় করা’র মধ্যে শামিল এবং তাও নেকী লাভের মাধ্যম।

৪। এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে যারা বিশ্বাস করে[1] ও পরলোকে যারা নিশ্চিত বিশ্বাসী।

[1] ‘পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস করা’র অর্থ হল এই যে, যে গ্রন্থসমূহ পূর্ববর্তী নবীগণের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা সবই সত্য। যদিও সেই কিতাব বা গ্রন্থাবলী বর্তমানে আসল (অপরিবর্তিত) অবস্থায় পাওয়া যায় না। তাই সেগুলির উপর আমল করাও যাবে না। এখন শুধু ক্বুরআন ও তার ব্যাখ্যা হাদীসের উপরেই আমল করতে হবে। এ থেকে এ কথাও জানা গেল যে, অহী ও রিসালাতের ধারাবাহিকতা রসূল (সাঃ) পর্যন্তই শেষ। তা না হলে তার (পরে আগত কোন রিসালাতের) উপর ঈমান আনার কথাও মহান আল্লাহ অবশ্যই উল্লেখ করতেন।

৫। তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।

এখানে সেই ঈমানদার বা বিশ্বাসীদের পরিণামের কথা বলা হয়েছে, যারা ঈমান আনার পর আল্লাহভীরু ও আমল করা সহ সঠিক আক্বীদার উপর কায়েম থাকার প্রতি যত্ন নেয়; কেবল মৌখিক ঈমান প্রকাশকে যথেষ্ট মনে করে না। আর সফলকাম হওয়ার অর্থ, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর রহমত ও ক্ষমা লাভ। এর সাথে যদি দুনিয়াতেও সুখ-সাছন্দ্য ও সফলতা লাভ হয়ে যায় তাহলে তো ‘সুবহানাল্লাহ’ (বিরাট সৌভাগ্য)। নচেৎ আখেরাতের সফলতাই হল প্রকৃত সফলতা।

৬। নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, তুমি তাদেরকে সতর্ক কর কিংবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য বরাবর, তারা ঈমান আনবে না।

নবী করীম (সাঃ)-এর বড়ই আশা ছিল যে, সবাই মুসলিম হয়ে যাক এবং সেই অনুপাতে তিনি প্রয়াসও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ বললেন, ঈমান তাদের ভাগ্যেই নেই। এরা এমন কিছু বিশেষ লোক ছিল যাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছিল। (যেমন আবূ জাহল এবং আবূ লাহাব প্রভৃতি।) নচেৎ তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ মুসলমান হয়েছিল। এমন কি পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে গিয়েছিল।

৭। আল্লাহ তাদের হৃদয় ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন, তাদের চোখের উপর আবরণ রয়েছে এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।

এখানে তাদের ঈমান না আনার কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু অব্যাহতভাবে কুফরী ও পাপের কাজ সম্পাদন করার কারণে তাদের অন্তঃকরণ থেকে সত্য গ্রহণ করার যোগ্যতা শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাদের কান হক কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং তাদের দৃষ্টি সারা বিশ্বের ছড়িয়ে থাকা মহান প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দেখা থেকে বঞ্চিত ছিল, তাই এখন তারা ঈমান কিভাবে আনতে পারে? ঈমান তো তাদেরই ভাগ্যে জোটে, যারা আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত যোগ্যতাকে সঠিকরূপে ব্যবহার করে এবং তার দ্বারা স্রষ্টার পরিচয় লাভ করে। এর বিপরীত লোকেরা তো সেই হাদীসের অর্থের আওতাভুক্ত, যাতে বলা হয়েছে যে, ‘‘মু’মিন যখন কোন পাপ করে বসে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। তারপর যখন সে তাওবা ক’রে পাপ থেকে ফিরে আসে, তখন তার অন্তর আগের মত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি তাওবা করার পরিবর্তে গুনাহের পর গুনাহ করতে থাকে, তাহলে সেই কালো দাগ ছড়িয়ে গিয়ে তার পুরো অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।’’ নবী করীম (সাঃ) বলেন, ‘‘এটাই হল সেই মরিচা যা মহান আল্লাহ ক্বুরআনে উল্লেখ করেছেন। {كَلاَّ بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} ‘‘কখনোও না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।’’ (তিরমিযী, তাফসীর সূরা মুত্বাফফিফীন ১৪ আয়াত) এই অবস্থাকেই ক্বুরআনে ‘খাতম’ (মোহর মারা) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে; যা তাদের অব্যাহত মন্দ কাজসমূহের যুক্তিসংগত প্রতিফল।

৮। মানুষের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী’, কিন্তু তারা বিশ্বাসী নয়।

এখান থেকে তৃতীয় দল মুনাফিক্বদের কথা আলোচনা আরম্ভ হচ্ছে। তাদের অন্তঃকরণ তো ঈমান থেকে বঞ্চিত ছিল, কিন্তু তারা ঈমানদারদেরকে প্রতারিত করার জন্য মৌখিকভাবে ঈমানের প্রকাশ করতো। মহান আল্লাহ বললেন, তারা না আল্লাহকে প্রতারিত করতে সফলকাম হবে, কেননা তিনি তো সর্ব ব্যাপারে জ্ঞাত, আর না ঈমানদারকে স্থায়ীভাবে ধোঁকার মধ্যে রাখতে পারবে, কেননা তিনি অহীর মাধ্যমে মুসলিমদেরকে তাদের প্রতারণা সম্পর্কে অবহিত ক’রে দিতেন। প্রকৃতপক্ষে এই প্রবঞ্চনার সমস্ত প্রকার ক্ষতির শিকার তারা নিজেরাই হয়েছে। যার ফলে তারা তাদের আখেরাত নষ্ট করেছে এবং দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত হয়েছে।

৯। আল্লাহ এবং বিশ্বাসীগণকে তারা প্রতারিত করতে চায়, অথচ তারা যে নিজেদের ভিন্ন কাউকেও প্রতারিত করে না, এটা তারা অনুভব করতে পারে না।

১০। তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন[1] ও তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাচারী।

[1] ‘ব্যাধি’ বলতে এখানে কুফরী ও নিফাক্বের (হার্দিক) ব্যাধিকে বুঝানো হয়েছে। এই ব্যাধি যদি সারানোর চিন্তা না করা হয়, তাহলে তা বাড়তে থাকে। অনুরূপ মিথ্যা বলা মুনাফিক্বদের একটি নিদর্শন; যা হতে দূরে থাকা অপরিহার্য।



About Author

Advertisement

Post a Comment

 
Top