Unknown Unknown Author
Title: সুরা আল-বাকারা (১১-২০ আয়াত) (পর্ব-৩)
Author: Unknown
Rating 5 of 5 Des:
সুরার নামঃ আল-বাকারা সুরা নম্বরঃ ২  সুরার ধরণঃ মাদানী সর্বমোট আয়াতঃ ২৮৬ অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)। ...

সুরার নামঃ আল-বাকারা
সুরা নম্বরঃ ২ 
সুরার ধরণঃ মাদানী
সর্বমোট আয়াতঃ ২৮৬

অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)।


১১। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা যমীনে ফাসাদ করো না’, তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী’।

১২। সাবধান! এরাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, (1) কিন্তু এরা তা অনুভব করতে পারে না।

(1) ‘ফাসাদ’ (অশান্তি, হাঙ্গামা, সন্ত্রাস) হল ‘সালাহ’ (শান্তি বা সংস্কার)-এর বিপরীত। কুফরী ও পাপাচারের কারণে যমীনে ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। আর আল্লাহর আনুগত্যে নিরাপত্তা ও শান্তি পাওয়া যায়। প্রত্যেক যুগের মুনাফিক্বদের কাজই হল যে, তারা অশান্তি সৃষ্টি করে, অন্যায়ের প্রচার-প্রসার করে এবং আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, কিন্তু তারা মনে করে বা দাবী করে যে, তারা সংস্কার, শান্তি ও উন্নতি করার চেষ্টায় লেগে আছে।

১৩। যখন তাদের বলা হয়, ‘অপরাপর লোকদের মত তোমারাও বিশ্বাস কর’, তারা বলে, ‘নির্বোধেরা যেরূপ বিশ্বাস করেছে আমরাও কি সেরূপ বিশ্বাস করব?’(1) সাবধান! এরাই নির্বোধ, কিন্তু এরা জানে না। (2)

(1) ঐ মুনাফিক্বরা সেই সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দেরকে অজ্ঞ-মুর্খ বা নির্বোধ বলেছে, যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল কুরবানী করতে কোন দ্বিধা করেননি। আর বর্তমানের মুনাফিক্বরা বুঝাতে চায় যে, সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ঈমান-ধন থেকেই বঞ্চিত ছিলেন -নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক। মহান আল্লাহ অতীত ও বর্তমান উভয় কালের মুনাফিক্বদের কথা খন্ডন ক’রে বলেন, উচ্চতর অভীষ্ট লাভের জন্য পার্থিব স্বার্থসমূহ কুরবানী দেওয়া অজ্ঞতা নয়, বরং তা-ই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা ও সৌভাগ্যের কাজ। সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)গণ তো এই সৌভাগ্যেরই প্রমাণ প্রস্তুত করেছেন। আর এই জন্যেই তাঁরা কেবল পাক্কা মু’মিনই নন, বরং তাঁরা হলেন (অপরের) ঈমান নির্ণায়ক মাপকাঠি ও কষ্টিপাথর। এখন তো ঈমান তারই গণ্য হবে, যে তাঁদের মত ঈমান আনবে। ‘‘তোমরা যেরূপ বিশ্বাস করেছ তারা যদি সেরূপ বিশ্বাস করে, তাহলে নিশ্চয় তারা সুপথ পাবে।’’ (সূরা বাক্বারা ১৩৭)

(2) পরিষ্কার কথা যে, সত্বর (নগদ) অর্জিত হয় এমন লাভের জন্য যা দেরীতে বা পরে অর্জিত হবে এমন লাভের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা, আখেরাতের স্থায়ী ও চিরন্তন জীবনের তুলনায় দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষকে ভয় করা হল অত্যধিক নির্বুদ্ধিতা। আর এই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় মুনাফিক্বরা দিয়ে এক বাস্তব সত্য থেকে অজ্ঞই রয়ে গেছে।

১৪। যখন তারা বিশ্বাসীগণের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, আমরা বিশ্বাস করেছি। আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তান(1) (দলপতি)দের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই রয়েছি; আমরা শুধু তাদের সাথে পরিহাস ক’রে থাকি।

(1) ‘শয়তানদল’ বলতে কুরাইশ ও ইয়াহুদীদের সেই দলপতিদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদের ইশারা ও ইঙ্গিতে তারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাত। অথবা মুনাফিক্বদের দলপতিদেরকে বুঝানো হয়েছে।

১৫। আল্লাহ তাদের সঙ্গে (জবাবে) উপহাস করেন এবং তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের মত তাদেরকে ঘুরে মরার অবকাশ দেন।

(1) ‘আল্লাহ তাদের সাথে পরিহাস করেন’-এর একটি অর্থ হল, যেভাবে তারা মুসলিমদের সাথে উপহাস ও বিদ্রূপমূলক কার্যকলাপ করে, আল্লাহও তাদের সাথে অনুরূপ কার্যকলাপ ক’রে তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেন। এটাকে ভাষাগত ব্যবহারে ‘পরিহাস’ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা পরিহাস নয়, বরং তা আসলে তাদের পরিহাস কর্মের শাস্তি। যেমন ‘‘মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই।’’ (সূরা শূরা ৪০ আয়াত) এই আয়াতে মন্দের প্রতিফলকেও মন্দ বলা হয়েছে। অথচ তা মন্দ নয়; বরং তা একটি বৈধ কাজ। তদনুরূপ ‘‘নিশ্চয় মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়। বস্তুত তিনিও তাদেরকে প্রতারিত ক’রে থাকেন।’’ (সূরা নিসা ১৪২ আয়াত) ‘‘অতঃপর তারা ষড়যন্ত্র করল এবং আল্লাহও কৌশল প্রয়োগ করলেন।’’ (আলে ইমরান ৫৪ আয়াত) প্রভৃতি আয়াতসমূহেও অনুরূপ এসেছে।

এর দ্বিতীয় অর্থ হল, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহও তাদের সাথে উপহাস করবেন। যেমন সূরা হাদীদের ১৩নং আয়াতে এর পরিষ্কার বর্ণনা রয়েছে।

১৬। এরাই সৎপথের বিনিময়ে ভ্রান্ত পথ ক্রয় করেছে। সুতরাং তাদের ব্যবসা(1) লাভজনক হয়নি, তারা সৎপথে পরিচালিতও নয়।

(1) ‘ব্যবসা’ বলতে সৎপথ ছেড়ে ভ্রষ্টতার পথ গ্রহণ করাকে বুঝানো হয়েছে, যা আসলেই নোকসানমূলক কারবার। মুনাফিক্বরা মুনাফিক্বীর পোশাক পরে এই ক্ষতিকর ব্যবসা করেছে। তবে এ ক্ষতি হল আখেরাতের ক্ষতি। আর এটা কোন জরুরী নয় যে, এই ক্ষতির জ্ঞান তাদের দুনিয়াতে লাভ হবে, বরং দুনিয়াতে তো এই মুনাফিক্বীর কারণে তাদের যে নগদ লাভ হতো, তাতে তারা বড়ই আনন্দবোধ করতো এবং এরই ভিত্তিতে তারা নিজেদেরকে বড় বুদ্ধিমান মনে করতো আর মুসলিমদের ভাবতো অজ্ঞ-মুর্খ !

১৭। তাদের দৃষ্টান্ত, যেমন এক ব্যক্তি অগ্নি-প্রজ্বলিত করল; তা যখন তার চারদিক আলোকিত করল, আল্লাহ তখন তাদের জ্যোতিঃ অপসারিত করলেন এবং তাদেরকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন; তারা কিছুই দেখতে পায় না।

(1) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং অন্যান্য সাহাবা (রাঃ) গণ এর অর্থ এই বর্ণনা করেন যে, যখন রসূল (সাঃ) মদীনায় গমন করলেন, তখন কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু তারা সত্বর আবার মুনাফিক্ব হয়ে যায়। তাদের দৃষ্টান্ত সেই লোকের মত যে অন্ধকারে ছিল; তারপর সে বাতি জ্বালাল। ফলে তার চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল এবং উপকারী ও অপকারী জিনিস তার সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল। হঠাৎ সে বাতি নিভে গেল এবং পুনরায় চতুর্দিক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। এই অবস্থা হল মুনাফিক্বদের। প্রথমে তারা শির্কের অন্ধকারে ডুবে ছিল। তারপর মুসলিম হয়ে আলোয় আসে। হালাল, হারাম এবং ভাল-মন্দ জেনে যায়। অতঃপর তারা আবার কুফরী ও নিফাক্বের দিকে ফিরে যায় ফলে সমস্ত আলো নিভে যায়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

১৮। তারা বধির, বোবা ও অন্ধ; সুতরাং তারা ফিরবে না।

১৯। কিংবা যেমন আকাশের মুষলধারা বৃষ্টি, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ-চমক। বজ্রধ্বনিতে তারা মৃত্যুভয়ে তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।

২০। বিদ্যুৎ-চমক তাদের দৃষ্টি-শক্তিকে প্রায় কেড়ে নেয়। যখনই বিদ্যুতালোক তাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়, তারা তখনই পথ চলতে থাকে এবং যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তখন তারা থমকে দাঁড়ায়। [1] আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করতেন। [2] নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

(1) এখানে মুনাফিক্বদের অপর আর এক দলের কথা বলা হচ্ছে, যাদের সামনে কখনো সত্য পরিষ্কার হয়ে যায় আবার কখনো তারা এ ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। কাজেই তাদের সন্দিগ্ধ ও সংশয়ী অন্তর হল সেই বৃষ্টির ন্যায় যা অন্ধকারে বর্ষিত হয়; এর গর্জন ও চমকে তাদের অন্তর ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে; এমনকি ভয়ের কারণে নিজেদের আঙ্গুলগুলো কানের মধ্যে গুঁজে দেয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাপনা এবং ভয়-ভীতি তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচাতে পারবে না। কেননা, তারা আল্লাহর বেষ্টনীর মধ্য থেকে বের হতে পারবে না। কখনো সত্যের কিরণ তাদের উপর পড়লে তারা তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু আবার যখন ইসলাম ও মুসলিমদের উপর কঠিন সময় আসে, তখন তারা উদভ্রান্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। (ইবনে কাসীর) মুনাফিক্বদের এ দল শেষ পর্যন্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ সংশয়ের শিকার হয়ে সত্য গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।

(2) এখানে এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারী দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাঁর প্রদত্ত সমস্ত যোগ্যতা ছিনিয়ে নিতে পারেন। কাজেই মানুষের উচিত, মহান আল্লাহর আনুগত্য করা থেকে দূরে এবং তাঁর পাকড়াও থেকে নির্ভয় না থাকা।


About Author

Advertisement

Post a Comment

 
Top